সরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী প্রেরণ

পাঁচ বছরে ৪০ হাজার কোটার বিপরীতে কর্মী গেছেন ১৫ হাজার

বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, আইন লঙ্ঘন ও দক্ষ শ্রমিকের অভাবে কমছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান। বিভিন্ন বিধিনিষেধ, ভিসা বন্ধসহ নানা করণে গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়েছে বড় শ্রমবাজার।

বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, আইন লঙ্ঘন ও দক্ষ শ্রমিকের অভাবে কমছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান। বিভিন্ন বিধিনিষেধ, ভিসা বন্ধসহ নানা করণে গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়েছে বড় শ্রমবাজার। যে কয়েকটি দেশ জনশক্তি আমদানি চালু রেখেছে সেসব দেশেও কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা সেভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশের শ্রমিকরা। বাংলাদেশের জন্য অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় দেশ পূর্ব এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এ দেশটিতেও চাহিদামতো জনশক্তি রফতানি করা যাচ্ছে না। দেশটি প্রতি বছর কোটা নির্ধারণ করলেও তা পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ।

দেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য মোট ৩৯ হাজার ২৫৫টি কোটা নির্ধারণ করে দক্ষিণ কোরিয়া। বিপরীতে বোয়েসেলের কাছে চাহিদাপত্র এসেছে ১৭ হাজার ২৪৭ জনের। তবে প্রতিষ্ঠানটি কর্মী পাঠিয়েছে ১৪ হাজার ৮২৯ জন, যা মোট কোটার ৩৭ শতাংশ।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিদেশী কর্মী নিয়োগ করা হয় এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমের (ইপিএস) মাধ্যমে। বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপালসহ ১৬টি দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শ্রম চুক্তির মাধ্যমে সেখানে কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতি বছরই অভিবাসী কর্মী নিয়োগে বিভিন্ন দেশের জন্য কোটা নির্ধারণ করে দেশটি। যার মাধ্যমে বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক শ্রমিক কাজের সুযোগ পান। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রথম দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হওয়ার মাধ্যমে বোয়েসেল এককভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প, নির্মাণ এবং কৃষি খাতে কর্মী পাঠানো শুরু করে। ২০০৮ সাল থেকে এ প্রক্রিয়ায় দেশটিতে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে।

দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী গেলেও কোটা পূরণ হচ্ছে না। যে কারণে পর্যাপ্ত জনশক্তি রফতানির সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের নির্ধারিত কোটা পূরণ না হলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমিক পাঠানো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ ঠিকই নির্ধারিত কোটার প্রায় সমপরিমাণ শ্রমিক পাঠাতে পারছে।

ইপিএসের আওতায় গত বছর নেপাল ১৬ হাজার ৪০০ কোটার বিপরীতে কর্মী পাঠিয়েছে ১৬ হাজার ৩০০, শ্রীলংকা ১০ হাজার ৬৩৪ কোটার বিপরীতে ৭ হাজার ১২২ জন এবং পাকিস্তান পাঠিয়েছে ২ হাজার ৬৪০ জন। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ শিল্প, নির্মাণ এবং কৃষি উভয় খাতে কর্মী পাঠাতে পারলেও পাকিস্তান শুধু শিল্প খাতে কর্মী পাঠাতে পারে।

২০২৪ সাল থেকে কোরিয়া যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন যশোরের মো. শিপন। অনার্স তৃতীয় বর্ষে কোরিয়ান ভাষা পরীক্ষায় পাস করে, স্কিল টেস্ট ও মেডিকেল টেস্ট শেষে এখনো বেকার বসে আছেন। ইপিএস সিস্টেমে রোস্টারভুক্ত আগের কর্মীরা দেশটিতে যেতে না পারায় শিপনের নামও যুক্ত করা হয়নি। কারণ রোস্টারভুক্ত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে কোনো কর্মী কোরিয়ায় যেতে না পারলে পুনরায় ভাষা পরীক্ষা, স্কিল টেস্ট, মেডিকেল টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে আবেদন করতে হবে।

মো. শিপন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৪ সাল থেকে বসে আছি। আমাদের নাম রোস্টারভুক্ত করা হলেই দুই বছরের মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। আগের অনেকেরই অপেক্ষা করতে করতে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কোরিয়া যেতে পারেনি। ২০২২ সালে ভাষা পরীক্ষায় পাস করে রোস্টারভুক্ত হওয়া প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোরিয়াগামী কর্মীর মেয়াদ শেষ। তারা যেতে চাইলে আবার ভাষা পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হবে। ২০২৩ সালে পরীক্ষা দিয়েছে এমন ৬০০ থেকে ৭০০ কর্মীর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের মার্চে। ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৪০০-এর বেশি ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইপিএস সিস্টেমে রোস্টারভুক্ত হয়েছেন। অনেকে অপেক্ষমাণ রয়েছেন। এত কঠিন ভাষা পরীক্ষায় পাস করেও দুই বছর অপেক্ষা শেষে যেতে পারছে না অনেকে। বেকার বসে থাকতে থাকতে অনেকেই নিঃস্ব। যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখছি না। খুব কম লোক নিচ্ছে।’

বোয়েসেলের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য ১০ হাজার ৩০০ কোটা নির্ধারণ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর বিপরীতে কর্মী গেছেন মাত্র ১ হাজার ২৪৪ জন। গত বছরও ১১ হাজার ৭০০ কোটার বিপরীতে দেশটিতে কর্মী গেছেন মাত্র ২ হাজার ৭৭৯ জন। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালেই সর্বোচ্চ কোটা পায় বাংলাদেশ। তবে এ কোটার মাত্র ২৪ শতাংশ লোক পাঠাতে পেরেছে বোয়েসেল। এছাড়া ২০২৩ সালে ১০ হাজার ২০০ জনের কোটার বিপরীতে ৪ হাজার ৮০৪, ২০২২ সালে ৫ হাজার ৯৪১ জনের কোটার বিপরীতে ৫ হাজার ৮৯১ এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ১১৪ জনের কোটার বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী গেছেন ১১১ জন। ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনা মহামারীর কারণে কর্মী নেয়ার হার ছিল কম। তবে এর পরের বছর প্রায় শতভাগ কর্মী পাঠাতে পারলেও গত তিন বছর ধরে দেশটিতে কর্মী যাওয়ার হার ক্রমাগতভাবে কমে আসছে।

বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শওকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাষা পরীক্ষায় পাস করার পর একটি স্কিল টেস্ট হয়। এ পরীক্ষায় পাস করার পর কোরিয়া যোগ্যদের নাম প্রকাশ করে। ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার এ তালিকা আমরা এইচআরডি কোরিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেই। তারা এটি তালিকাভুক্ত করে সেখানকার শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে তারা দেশটির বিভিন্ন জব সেন্টারে তালিকা পাঠিয়ে দেয়। কোম্পানিগুলো যে দেশের লোক চায় সেই অনুযায়ী একজনের বিপরীতে তিনটি প্রোফাইল পাঠায় তারা। তারপর কোম্পানি কর্মী সিলেক্ট করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কোরিয়ার হাতে, আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারাই কর্মীর প্রোফাইল দেখে সিলেক্ট করে।’

বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার হার কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেসব দেশ থেকে বেশি কর্মী নেয়া হচ্ছে সেসব দেশের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার ধর্ম, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে মিল রয়েছে। ভাষার ব্যবহারেও একটি সীমাবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ কিছু কারণও আছে। সে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক কারণেও কম লোক নিচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে কর্মী যায় মূলত দেশটির এসএমই খাতে, তারা বড় কোনো কোম্পানি না। তাদের অর্থিক মন্দার কারণে খণ্ডকালীন কর্মী দিয়ে অনেক কোম্পানি কাজ করাচ্ছে। এইচআরডি কোরিয়ার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে আমাদের এমনটিই জানিয়েছে। তবে আশা করছি এ বছর চার হাজার কর্মী যেতে পারবে। এছাড়া দেশটিতে আমরা ছয়জন প্রতিনিধি নিয়োগ করেছি, যারা নিয়মিত নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। যাতে বাংলাদেশ নিয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয় এবং বেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হয়।’

‘লেসনস ফ্রম কোরিয়াস এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস সিস্টেমে যুক্ত এসএমই খাতে ৩ শতাধিকেরও কম নিয়োগকর্তা। ৪৫ শতাংশ নিয়োগকর্তাই পাঁচজন কর্মী দিয়ে কোম্পানি পরিচালনা করে। ৫০ জনের অধিক কর্মী আছে এমন কোম্পানির সংখ্যা ৫ শতাংশ। ইপিএস সিস্টেমে যুক্ত নিয়োগকর্তারা ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে যেসব কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন সেখানে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনামের কর্মীরা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপাল। তাদের ভাষাগত দক্ষতা বেশি বলে জানিয়েছে নিয়োগকর্তারা। এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কর্মী নিয়োগে পছন্দের দেশের তালিকায় সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।

যে পরিমাণ কোটা, সে হারে কর্মী পাঠাতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক—এমন মন্তব্য করে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্লাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বিদেশে কর্মী পাঠানোর সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস পদ্ধতি। এখানে পরীক্ষার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কর্মী যান এবং ভালো বেতন পান। কয়েক বছরের মধ্যেই কর্মীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। একদিকে কোটা পূরণ হচ্ছে না, অন্যদিকে পরীক্ষায় পাস করে যেতে না পারা কর্মীরা আন্দোলন করে। এটা দুঃখজনক। কোটা শতভাগ পূরণ করতে কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার। যেসব সমস্যার জন্য কর্মীর চাহিদা আসছে না সেগুলো খতিয়ে দেখে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।’

আরও